বর্তমান মূল্যবোধে জৈন দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা

Author(s): Khagendra Chandra Das
Assistant Professor
Dept. of Philosophy
Sailajananda Falguni Smriti Mahavidyalaya
Khayrasole, Birbhum, West Bengal, India
Email: khagendrasfs@gmail.com
Page no: 366-372

Abstract: ভারতীয় নীতিবিদ্যা (Indian Ethics) হল দর্শনের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যা ভাল-মন্দ, সৎ-অসৎ, ন্যায়-অন্যায়, এই নৈতিক নিয়মাবলী ও মানবজীবনের পরম লক্ষ্য নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করে। তাঁরা শুধুমাত্র মানুষের আচরণগত দিক গুলি নির্দেশ করে না, বরং মানুষকে জীবনমুখী ও মুক্তিমুখী হতে সহায়তা করেছে। ভারতীয় নীতিবিদ্যায় মূল্যবোধের ধারণা (Concept of Values) প্রাচীন কাল থেকেই গভীর আধ্যাত্মিক ও আত্মবিকাশমুখ মানুষের জীবনের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে। এই মূল্যবোধগুলি কেবলমাত্র কতকগুলি সামাজিক নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং মানুষের চূড়ান্ত কল্যাণ লাভের সহায়ক ও মোক্ষলাভের পথপ্রদর্শক হিসেবেও বিবেচিত হয়। সাধারণত মূল্যবোধ বলতে বোঝায়-জীবনে কোনটা ভাল বা উত্তম, কল্যাণকর, শুদ্ধ, ন্যায়সঙ্গত ও মুক্তি লাভে সহায়ক। ভারতীয় দর্শনে এগুলোকে ধর্ম, কর্ম, নৈতিক সদাচরণ ও জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। জৈন দর্শন যদি আমরা মূল্যায়ন করি তবে লক্ষ্য করব যে, মূল্যবোধের ধারণা মূলত অহিংস ধর্ম,পুণ্য,পাপ থেকে আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির পথকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে। তাঁদের মতে, নৈতিক মূল্যবোধ (values) বলতে বোঝায়, এমন নৈতিক নিয়মাবলী বা আদর্শক যা আত্মোন্নতি, অহিংস জীবনধারা ও যা সর্বজীবের পরম কল্যাণে সহায়ক। জৈন দর্শনে নৈতিক আদর্শ হিসাবে আমরা যদি লক্ষ্য করি তবে দেখব যে, আত্মার তিনটি অবস্থা (ত্রিরত্ন) তিনটি শব্দের দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে। এই তিনটি মহামূল্যবান রত্ন (সম্যক্‌দর্শন, সম্যক্জ্ঞান ও সম্যক্‌চরিত্র) মুক্তির একমাত্র মাধ্যম। আচার্য উমাস্বাতি তত্ত্বার্থসূত্রে বলেছেন, ‘সম্যগ্‌ জ্ঞান- দর্শনচরিত্রানি মোক্ষমার্গঃ’। এই তিনটি রত্ন মিলিত হয়ে পরম পুরুষার্থ মোক্ষকে সম্পাদন করে থাকে। পঞ্চমহাব্রত (অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ) এবং অনুব্রত এর ওপর ভিত্তি করেই এই দর্শনে নৈতিক মূল্যবোধের ধারণাটি গঠিত হয়েছে। জৈন নৈতিকতার মূল কেন্দ্রে রয়েছে অহিংসা নীতি। এটি শুধু কায়, মন, বাক্য, দ্বারা কোনো প্রাণীর ক্ষতি না করাকে বোঝায়। যে কোন জীবহত্যা, পশুহত্যা, এমনকি উদ্ভিদ বা জলের অণুজীব ধ্বংস করাও অপরাধ বলে এই দর্শনে বিবেচিত। নিজের লক্ষ্য ও চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বদাই সত্য কথা বলা উচিত। মিথ্যাকথন সর্বদাই পরিহার এবং বাক্য যেন অহিংস ও কল্যাণকর হয়- এই হল সত্যের নৈতিক রূপ। অন্যের কাছ থেকে অনুমতি ছাড়া কিছু না নেওয়া এবং ইচ্ছা, ভাবনা ও কর্মে চৌর্যবৃত্তির প্রতি সম্পূর্ণ বিরতবোধ থাকাকে অস্তেয় বোঝায়। সর্বদাই কামনা-বাসনা বা ইন্দ্রিয় সুখ সম্ভোগ থেকে সদামুক্ত থাকাই হল ব্রহ্মচর্য। কোন গৃহস্থ ও সন্ন্যাসী উভয়ের জন্য উপযুক্ত সংযমের নৈতিক বিধান রয়েছে। পার্থিব ধন-সম্পদ, বস্তুগত কাম্যবিষয় ও সম্পর্কের প্রতি আসক্তিহীনতা ভাবে বৈরাগ্য জীবনযাপনই মুক্তির উত্তম পথের নিদান দেওয়া হয়েছে যা অপরিগ্রহ নামে খ্যাতি লাভ করেছে। এগুলি যারা পালন না করে তাঁরা নরকগামী হয়।
জৈন দর্শনের মূল্যবোধগুলো গভীরভাবে মনুষ্য জীবনের আত্মসংযম, অহিংস নীতি ও পরম মুক্তির লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অপরদিকে এগুলি কেবল ব্যাক্তিগত নৈতিকতা নয়, বরং সর্বজীবের প্রতি সহমর্মিতা, সহানুভুতিতা ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠারও একটি গুরুত্ব পূর্ণ মাধ্যম। বর্তমান সময়ে মূল্যবোধের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা (Relevance of Values in the Present Context) বিষয়টি সমগ্র বিশ্বে সমালোচিত। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে অত্যন্ত মৌলিক ভিত্তি সিসাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে এই মূল্যবোধের ধারণা। আধুনিক কর্মময় গতিময়, প্রতিযোগিতা মূলক জীবনে এবং ভোগবাদী, সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের মধ্যেও ভারতীয় নৈতিক আদর্শ ও মূল্যবোধ মানবজীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার প্রধান শক্তি প্রদান করে থাকে। মূল্যবোধ কেবমাত্র অতীতের ধ্যানধারণা নয় বরং তা আজকের সমাজ, উন্নতিশীল জাতির উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি। ভারতীয় মূল্যবোধ গুলি হল, যেমন- সত্য, অহিংসা, দায়িত্ববোধ, সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান এগুলো আজও মানবসভ্যতার মূল চালিকাশক্তি। সমগ্র মানবজীবনের প্রতি করুণা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সমান দৃষ্টিভঙ্গি রেখেছ এই দার্শনিক সম্প্রদায়টি উচ্চস্থান গ্রহণ করেছে। 

Keywords: মূল্যবোধ, মুক্তি, ধর্ম, অহিংসা, সত্য, পুরুষার্থ।
Scroll to Top