মেঘনাদবধ-মহাকাব্যে রস-বৈষম্য

Author(s): Avijit Pandit
Assistant Professor
Dept. of Sanskrit, Belda College
Belda, Paschim Medinipur, West Bengal, India.
Email ID: avijitpanditsanskrit09@gmail.com
Page no: 359-365

Abstract: বাংলা কাব্য-সাহিত্যের আধুনিক-ইতিহাসের একটি অন্যতম কীর্তিস্তম্ভ হল ‘মাইকেল মধুসূদন দত্তের’ অমিত্রাক্ষর ছন্দে বিরচিত ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্য। ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যে উনিশ-শতকীয় নতুন মূল্যবোধের প্রেরণায় রামায়ণ কাহিনীকে নতুন করে রূপ দিয়েছেন। সংস্কৃত-অলংকারশাস্ত্রানুসারে কাব্যে প্রধান বা মুখ্যরস হবে একটি, যা হল অঙ্গীরস। ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অন্যান্য রস সমূহ, মুখ্যরস বা অঙ্গীরসের অঙ্গরূপে উপস্থিত হয়। ‘কিরাতার্জুনীয়ম্’, ‘শিশুপালবধম্’ ইত্যাদি বীররসাশ্রিত মহাকাব্যসমূহে করুণ রসের আধিক্য দেখাযায় না বা অলংকারশাস্ত্রের নিয়মানুসারে তা হওয়ার ও কথা নয়; যদিও বা ‘উত্তররামচরিতম্’ নামক করুণরসাশ্রিত মহাকাব্যে বীররসই পরিপূরক। বীররসের প্রয়োজন তখনই হয়, কোথাও যদি কাহিনীর নায়ক, নায়িকা বা মুখ্যচরিত্র কারুণ্য বা শোকের আবহে মূহ্যমান হয়েযায় বা যখন শৃঙ্গারাদি অন্যান্য রসসমূহ কোনভাবেই মুখ্যচরিত্রকে কারুণ্যের আবহথেকে মুক্ত করতে পারে না। মেঘনাদবধ মহাকাব্যের প্রারম্ভে করুন রসের সূত্রপাত কিন্তু তার পরিপূরক রূপে প্রথমে বীর রসের উন্মেষ ঘটে, অতঃপর করুণ রস ও বীর রস কাছাকাছি থেকে প্রবাহিত হয় সারাকাব্য জুড়ে, সর্বশেষে পুনরায় কাব্যের সমাপ্তি ঘটে করুণ রসের মাধ্যমে। তাই সাধারণ বিচারে এই কাব্য করুণ রসের মহাকাব্য হিসেবে পরিগণিত হয়, সহৃদয়-পাঠকের মতে এ এক করুণ রসের মহাকাব্য। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনীকার ‘যোগীন্দ্রনাথ বসু’ও এ সম্পর্কে বলেছেন— “মেঘনাদবধে বীররসের অপেক্ষা করুণরসেরই প্রাধান্য।” বিয়োগান্তক কাব্য বা নাটক যে করুণ রসাশ্রিত হয় তা বলাই বাহুল্য, সে দিক থেকে অলংকারশাস্ত্রের অনুশাসন মেনেই মেঘনাদবধ মহাকাব্য করুণ রসের ধারায় সিক্ত হয়েছে। কিন্তু মেঘনাদবধ মহাকাব্যের প্রস্তাবনায় কবি শ্রীমধুসূদন সরস্বতীদেবীর নিকট যে প্রার্থনা করেছেন— “গাইব, মা, বীররসে ভাসি, মহাগীত”।১ –এই উক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে বীররসাশ্রিত কাব্য রচনাই কবির অভিপ্রেত ছিল। কাব্যের মুখ্যবিষয় যুদ্ধ-সংঘাত-ঘাতপ্রতিঘাত, তা কেবলমাত্র বীর রসেরই স্থায়ীভাব সৃষ্টি করে। এখন এই প্রশ্ন উত্থিত হয় যে— নায়কের করুণ পরিণতি কবির কি প্রথমে অনভিপ্রেত ছিল! না কি কবি লিখতে চেয়েছিলেন অন্য কোনও রসাশ্রিত কাব্য! না কি বীর-রস করুণ-রসের অবলম্বন ব্যতীত অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলেই কি কাব্যের এই বিষম-পরিণতি! কিন্তু মহাকাব্যে ‘মেঘনাদ’ চরিত্রটি বীরত্বের প্রতীক তথা বীর রসের প্রতীক, অপরদিকে ‘বধ’ কারুণ্যের তথা করুণ রসের প্রতীক। কাব্যে কোন রসের প্রাধান্য প্রকাশিত হয়েছে তা সহৃদয়-পাঠকের বিচারাধীন কিন্তু কবির মানসপটে যে মুখ্যতঃ মেঘনাদ-চরিত্রটি বিচরণ করেছেন তার প্রমাণ কাব্যের প্রস্তাবনায় উক্ত রস-নির্দেশ থেকেই স্পষ্ট হয়েছে। কাব্যে রসনির্মাণ হল চরিত্রনির্ভর, ঘটনানির্ভর নয়। ‘বধ’ এখানে ঘটনামাত্র, কোনও চরিত্র নয়। ‘মেঘনাদ’, ‘লক্ষ্মণ’, ‘রাবণ’ প্রভৃতি বীরেরা কাব্যের চরিত্র —তাই ‘বীর’ রসই এই কাব্যের মুখ্যরস; কবি-প্রতিভাকে সমর্থন করেই অলংকারশাস্ত্রের দৃষ্টিতে কাব্যে উপস্থিত বিবিধ-রস-বৈষম্য অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি এই শৌধপত্রে।

Keywords: সংস্কৃত-অলংকারশাস্ত্র, রস, স্থায়ীভাব, করুণ-রস, বীর-রস, চরিত্র, ঘটনা।

Scroll to Top